হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম: এক অসাধারণ জীবনোপাখ্যান
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের মধ্যে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জীবনী এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর জীবন কাহিনী কেবল চিত্তাকর্ষকই নয়, বরং ধৈর্য, প্রজ্ঞা, ক্ষমা, নৈতিকতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউসুফকে "আহসানুল কাসাস" বা "সর্বোত্তম কাহিনী" হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই কাহিনীতে রয়েছে মানব জীবনের উত্থান-পতন, ষড়যন্ত্র, বিচ্ছেদ, দুঃখ-কষ্ট এবং অবশেষে পরম করুণাময়ের অনুগ্রহে সাফল্য ও মিলনের এক অপূর্ব চিত্র। হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর জীবন পরিক্রমা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়াবলীতে পরিপূর্ণ। শৈশবের স্বপ্ন থেকে শুরু করে মিসরের শাসনকর্তা হওয়া পর্যন্ত তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ঈমান ও তাকওয়ার আলোকে উদ্ভাসিত। এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর পুণ্যময় জীবনের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত ইউসুফ (আঃ) ছিলেন কান'আন (বর্তমান ফিলিস্তিন) অঞ্চলের অধিবাসী। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র নবী হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর পুত্র, হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পৌত্র এবং হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর প্রপৌত্র। তাঁর মাতার নাম ছিল রাহিল (বা রাহেলা)। হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর মোট বারো জন পুত্র ছিলেন, যাদের থেকে বনী ইসরাইলের বারোটি গোত্রের সূচনা হয়। ইউসুফ (আঃ) এবং তাঁর ছোট ভাই বিনইয়ামিন ছিলেন রাহিলের সন্তান। অন্যান্য ভাইয়েরা ছিলেন ইয়াকুব (আঃ)-এর অন্য স্ত্রীদের গর্ভজাত। বংশ পরম্পরায় নবুয়তের ধারায় লালিত হযরত ইউসুফ (আঃ) শৈশব থেকেই ছিলেন অসাধারণ সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা ও সচ্চরিত্রের অধিকারী। পিতা ইয়াকুব (আঃ) তাঁকে অন্য পুত্রদের তুলনায় অধিক স্নেহ করতেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর ভাইদের মনে ঈর্ষার জন্ম দেয়।
শৈশব ও অলৌকিক স্বপ্ন
হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন অল্প বয়স্ক বালক, তখন তিনি এক বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি দেখলেন যে, এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্র তাঁকে সিজদা করছে। এই স্বপ্নের কথা তিনি তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আঃ)-কে জানালে, ইয়াকুব (আঃ) স্বপ্নের তাৎপর্য বুঝতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ (আঃ)-কে ভবিষ্যতে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন এবং তাঁর ভাইয়েরা ও পিতামাতা তাঁর অনুগত হবেন। কিন্তু এই স্বপ্নের গভীরতা ও এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করে তিনি ইউসুফ (আঃ)-কে সতর্ক করে দেন যেন তিনি এই স্বপ্নের কথা তাঁর ভাইদের কাছে প্রকাশ না করেন। কারণ, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, ভাইয়েরা এই স্বপ্নের কথা জানতে পারলে তাদের অন্তরে ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তারা তাঁর ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করতে পারে। পবিত্র কুরআনে এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে এভাবে:
"স্মরণ কর, যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিল, ‘হে আমার পিতা! আমি তো দেখেছি এগারটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রকে; আমি দেখলাম তারা আমার প্রতি সিজদাবনত’।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪)
"তিনি (ইয়াকুব) বললেন, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের নিকট বর্ণনা করো না; করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫)
পিতার এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও, নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম।
ভাইদের ষড়যন্ত্র ও কূপে নিক্ষেপ
পিতা ইয়াকুব (আঃ)-এর অতিরিক্ত স্নেহ এবং ইউসুফ (আঃ)-এর বিশেষ গুণাবলী তাঁর বৈমাত্রেয় ভাইদের মনে তীব্র ঈর্ষার জন্ম দেয়। তারা মনে করত, পিতা তাদের চেয়ে ইউসুফ ও বিনইয়ামিনকে বেশি ভালোবাসেন, যা তাদের জন্য ছিল অসহনীয়। তারা একত্রিত হয়ে ইউসুফ (আঃ)-কে সরিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র করে। তাদের মধ্যে কেউ প্রস্তাব দিল তাঁকে হত্যা করার, কেউ বলল মরুভূমিতে ফেলে আসার। অবশেষে, তারা তাঁকে এক গভীর কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে কোনো পথিক দল তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং তিনি তাদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যান।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা একদিন পিতার কাছে এসে আবদার করে যেন ইউসুফ (আঃ)-কে তাদের সাথে মাঠে খেলাধুলা ও মেষ চরাতে যাওয়ার অনুমতি দেন। তারা প্রতিজ্ঞা করে যে, তারা তাঁর পূর্ণ খেয়াল রাখবে। হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্রদের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত না থাকলেও, তাদের বারংবার অনুরোধ ও প্রতিশ্রুতির মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি দেন। তবে তিনি তাদের বিশেষভাবে সতর্ক করে দেন যেন তারা ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি যত্নবান হয় এবং কোনো হিংস্র প্রাণী যেন তাঁর ক্ষতি করতে না পারে।
ভাইয়েরা ইউসুফ (আঃ)-কে সাথে নিয়ে মাঠের দিকে রওনা হয়। সুযোগ বুঝে তারা তাঁকে একটি পরিত্যক্ত ও গভীর কূপে নিক্ষেপ করে। এরপর তারা একটি ছাগল জবাই করে তার রক্ত ইউসুফ (আঃ)-এর জামায় মাখিয়ে নেয়। সন্ধ্যায় তারা কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে ফিরে আসে এবং বলে যে, তারা যখন দৌড় প্রতিযোগিতা করছিল, তখন একটি নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফ (আঃ)-কে খেয়ে ফেলেছে এবং প্রমাণস্বরূপ তারা রক্তমাখা জামাটি দেখায়।
হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাদের কথায় বিশ্বাস করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এটি তাদের একটি ষড়যন্ত্র। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। তিনি সীমাহীন পুত্রশোকে কাতর হয়ে পড়েন, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধারণ করেন। তিনি বলেন, "বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং, উত্তম ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১৮) এই ঘটনা থেকে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর অসাধারণ ধৈর্য (সবরে জামিল) এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থার পরিচয় পাওয়া যায়।
কূপ থেকে উদ্ধার ও মিসরে দাসত্ব
কয়েকদিন পর, একটি বাণিজ্য কাফেলা সেই কূপের নিকটবর্তী স্থানে বিশ্রামের জন্য থামে। তারা কূপ থেকে পানি তোলার জন্য লোক পাঠালে, বালতির সাথে হযরত ইউসুফ (আঃ) উঠে আসেন। কাফেলার লোকেরা এই সুন্দর বালককে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয় এবং তাঁকে পণ্য হিসেবে গণ্য করে লুকিয়ে রাখে। অতঃপর তারা মিসরে পৌঁছে তাঁকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করে দেয়। মিসরের তৎকালীন ‘আজিজ’ (রাজকোষাধ্যক্ষ বা প্রধানমন্ত্রী, কারো মতে কিতফির বা ফোতিফার) তাঁকে ক্রয় করেন। আজিজ ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি ইউসুফ (আঃ)-এর রূপ-লাবণ্য ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর স্ত্রীকে (যিনি জুলেখা নামে পরিচিত) বলেন:
"একে সম্মানের সাথে রাখো, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপেও গ্রহণ করতে পারি।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২১)
এভাবেই আল্লাহর পরিকল্পনায় হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের এক অভিজাত পরিবারে আশ্রয় লাভ করেন। সেখানে তিনি পরম যত্নে বড় হতে থাকেন এবং তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক মাধুর্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
জুলেখার কুমন্ত্রণা ও ইউসুফের চারিত্রিক দৃঢ়তা
হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর অসাধারণ রূপ-সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব আজিজের স্ত্রী জুলেখাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। জুলেখা তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে কুপথে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন। একদিন তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে ইউসুফ (আঃ)-কে নিজের দিকে আহ্বান জানান। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আঃ) ছিলেন আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি জুলেখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন:
"আল্লাহ্র পানাহ! আমার প্রভু (আজিজ) আমাকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দিয়েছেন। নিশ্চয়ই সীমালঙ্ঘনকারীরা সফল হয় না।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৩)
এই বলে তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। জুলেখা পেছন থেকে তাঁর জামা টেনে ধরেন, ফলে জামার পেছন দিক ছিঁড়ে যায়। এমন সময় দরজার বাইরে আজিজের সাথে তাদের দেখা হয়। জুলেখা নিজের দোষ ঢাকার জন্য তৎক্ষণাৎ ইউসুফ (আঃ)-এর উপর দোষারোপ করে বলেন যে, ইউসুফ (আঃ) তাঁর প্রতি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন।
হযরত ইউসুফ (আঃ) নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে বলেন যে, জুলেখাই তাঁকে প্ররোচিত করেছিলেন। এই সময় জুলেখার পরিবারের এক জ্ঞানী ব্যক্তি (মতান্তরে একটি শিশু) সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, "যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে, তবে মহিলা সত্য বলেছে এবং সে (ইউসুফ) মিথ্যাবাদী। আর যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া থাকে, তবে মহিলা মিথ্যা বলেছে এবং সে (ইউসুফ) সত্যবাদী।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২৬-২৭)
যখন দেখা গেল জামাটি পেছন দিক থেকে ছেঁড়া, তখন আজিজ প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারলেন। তিনি জুলেখাকে তিরস্কার করেন এবং ইউসুফ (আঃ)-কে এই ঘটনা গোপন রাখতে বলেন।
কিন্তু এই ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। শহরের অভিজাত মহিলারা জুলেখাকে নিয়ে কানাঘুষা করতে থাকে যে, তিনি তাঁর দাসের প্রেমে পড়েছেন। জুলেখা এই সমালোচনা শুনে ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের একটি উচিত শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তিনি এক ভোজসভার আয়োজন করেন এবং সেই মহিলাদের আমন্ত্রণ জানান। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ফল ও ছুরি দেওয়া হয়। যখন তারা ফল কাটতে ব্যস্ত, তখন জুলেখা হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে তাদের সামনে উপস্থিত হতে বলেন। ইউসুফ (আঃ)-এর স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখে মহিলারা এতটাই মুগ্ধ ও বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, তারা ফলের পরিবর্তে নিজেদের হাত কেটে ফেলেন এবং বলে ওঠেন, "আল্লাহ্ মহান! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক সম্মানিত ফেরেশতা!" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩১)
তখন জুলেখা বলেন, "এই তো সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছিলে। আমি অবশ্যই তার নিকট থেকে অসৎ কামনা করেছিলাম, কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে। আমি তাকে যা আদেশ করছি, তা যদি সে না করে, তবে সে অবশ্যই কারারুদ্ধ হবে এবং অপমানিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩২)
হযরত ইউসুফ (আঃ) এই পরিস্থিতিতে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে কারাবরণকে শ্রেয় মনে করেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:
"হে আমার রব! তারা আমাকে যার দিকে ডাকছে, তার চেয়ে কারাগার আমার নিকট অধিক প্রিয়। আপনি যদি তাদের ষড়যন্ত্র আমার থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৩)
আল্লাহ তা'আলা তাঁর দোয়া কবুল করেন। আজিজ ও তাঁর পারিষদবর্গ ইউসুফ (আঃ)-এর নির্দোষিতা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও, সামাজিক কেলেঙ্কারি ও জুলেখার সম্মান রক্ষার জন্য তাঁকে কিছুদিনের জন্য কারাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
কারাবাস ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা
কারাগারে হযরত ইউসুফ (আঃ) দুজন সহবন্দী লাভ করেন। তারা ছিলেন রাজার পানীয় পরিবেশক এবং প্রধান রুটি প্রস্তুতকারক। তারা উভয়েই একটি করে স্বপ্ন দেখেন এবং ইউসুফ (আঃ)-এর ধার্মিকতা ও প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চান।
প্রথমজন (পানীয় পরিবেশক) স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি আঙ্গুর নিংড়ে মদ তৈরি করছেন। দ্বিতীয়জন (রুটি প্রস্তুতকারক) দেখেন যে, তিনি মাথায় রুটির ঝুড়ি বহন করছেন এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে।
হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে তাদের আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রভুর উপাসনা করা উত্তম, নাকি এক ও পরাক্রমশালী আল্লাহর উপাসনা করা? অতঃপর তিনি তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন। তিনি পানীয় পরিবেশককে বলেন যে, সে শীঘ্রই মুক্তি পাবে এবং পুনরায় রাজার খেদমতে নিযুক্ত হবে। আর রুটি প্রস্তুতকারককে বলেন যে, তাকে শূলে চড়ানো হবে এবং পাখিরা তার মাথার মাংস খাবে।
পরবর্তীকালে তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ঘটনা ঘটে। পানীয় পরিবেশক মুক্তি পাওয়ার সময় হযরত ইউসুফ (আঃ) তাকে অনুরোধ করেন যেন সে রাজার কাছে তাঁর নির্দোষিতার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় সে এই কথা ভুলে যায়। ফলে হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে আরও কয়েক বছর কারাগারে কাটাতে হয়। পবিত্র কুরআনে এই সময়কালকে "বিদ'আ সিনীন" (কয়েক বছর) বলা হয়েছে, যা সাধারণত তিন থেকে নয় বছর পর্যন্ত সময়কে বোঝায়।
রাজার স্বপ্ন, মুক্তি ও সম্মান লাভ
কয়েক বছর পর, মিসরের তৎকালীন বাদশাহ (সম্ভবত একজন হাকসোস রাজা) এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, সাতটি মোটাতাজা গাভীকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও সাতটি শুকনো শীষ। রাজা এই স্বপ্নের কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং রাজ্যের সকল জ্ঞানী, জ্যোতিষী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারককে ডেকে পাঠান। কিন্তু কেউই এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারল না। তারা বলল, "এগুলো তো অর্থহীন কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন, আমরা এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানি না।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৪)
এই সময় সেই পানীয় পরিবেশকের হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কথা মনে পড়ে। সে রাজার অনুমতি নিয়ে কারাগারে ইউসুফ (আঃ)-এর কাছে যায় এবং স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানায়। হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন:
"তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষাবাদ করবে। অতঃপর তোমরা যা কাটবে, তার মধ্যে সামান্য অংশ যা তোমরা খাবে, তা ব্যতীত সমস্ত শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, এই সাত বছর পূর্বে সঞ্চিত শস্য খেয়ে ফেলবে, কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে, তা ছাড়া। অতঃপর এমন এক বছর আসবে, যখন মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং তারা প্রচুর ফলের রস নিংড়াবে (অর্থাৎ প্রাচুর্য ফিরে আসবে)।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪৭-৪৯)
এই ব্যাখ্যা শুনে রাজা অত্যন্ত প্রভাবিত হন এবং হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে তাঁর নিকট উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ইউসুফ (আঃ) কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার আগে তাঁর উপর আরোপিত মিথ্যা অভিযোগের পূর্ণ তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, "তোমার প্রভুর নিকট ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর, যে মহিলারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল, তাদের অবস্থা কী? আমার রব তো তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫০)
রাজা তখন সেই মহিলাদের ডেকে পাঠান এবং জুলেখাকেও তলব করেন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে জুলেখা এবং অন্যান্য মহিলারা সত্য স্বীকার করেন। জুলেখা বলেন, "এখন সত্য প্রকাশিত হয়েছে। আমিই তাকে প্ররোচিত করেছিলাম, আর সে অবশ্যই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫১)
এভাবে হযরত ইউসুফ (আঃ) সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন। রাজা তাঁর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও চারিত্রিক সততায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কেবল মুক্তিই দেননি, বরং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দেন। হযরত ইউসুফ (আঃ) দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য দেশের খাদ্য ও অর্থভান্ডারের দায়িত্ব চেয়ে নেন। তিনি বলেন, "আমাকে দেশের ধনভান্ডারের উপর কর্তৃত্ব দান করুন। আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)
রাজা তাঁকে এই পদে নিযুক্ত করেন। এভাবে হযরত ইউসুফ (আঃ), যিনি একদিন ক্রীতদাস হিসেবে মিসরে এসেছিলেন এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন, তিনি আল্লাহর অশেষ করুণায় মিসরের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন।
মিসরের প্রশাসক ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা
হযরত ইউসুফ (আঃ) অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তিনি প্রথম সাত বছর ব্যাপক শস্য উৎপাদনের ব্যবস্থা করেন এবং উৎপাদিত ফসলের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতের জন্য গুদামজাত করেন। এরপর যখন দুর্ভিক্ষের সাত বছর শুরু হয়, তখন তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চিত খাদ্যশস্য জনগণের মধ্যে বিতরণ করেন। তাঁর সুনিপুণ ব্যবস্থাপনার ফলে মিসরবাসী দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পায়। শুধু মিসর নয়, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষও খাদ্যের জন্য মিসরে আসতে শুরু করে।
ভাইদের সাথে পুনর্মিলন
দুর্ভিক্ষের সময় কান'আন দেশেও খাদ্যাভাব দেখা দেয়। হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্রদের (বিনইয়ামিন ব্যতীত) খাদ্যশস্য সংগ্রহের জন্য মিসরে পাঠান। তারা যখন ইউসুফ (আঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হয়, তখন ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদের চিনতে পারেন, কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারেনি। কারণ, বহু বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং ইউসুফ (আঃ) তখন মিসরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদের সাথে স্বাভাবিক আচরণ করেন এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যশস্য দেন। তবে তিনি একটি শর্ত দেন যে, পরের বার যখন তারা আসবে, তখন যেন তাদের বৈমাত্রেয় ভাই (বিনইয়ামিন)-কে সাথে নিয়ে আসে। তিনি বলেন, যদি তারা বিনইয়ামিনকে না আনে, তবে তাদের আর খাদ্যশস্য দেওয়া হবে না। তাদের আশ্বস্ত করার জন্য এবং পুনরায় আসতে উৎসাহিত করার জন্য তিনি গোপনে তাদের প্রদত্ত মূল্য তাদের সামগ্রীর সাথেই ফেরত পাঠিয়ে দেন।
ভাইয়েরা ফিরে গিয়ে পিতাকে সব ঘটনা জানায় এবং বিনইয়ামিনকে সাথে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়। হযরত ইয়াকুব (আঃ) প্রথমে রাজি হননি, কারণ ইউসুফ (আঃ)-কে হারিয়ে তিনি এমনিতেই শোকাহত ছিলেন। কিন্তু ছেলেদের বারংবার অনুরোধ এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তিনি অবশেষে অনুমতি দেন, তবে তাদের কাছ থেকে কঠোর প্রতিজ্ঞা আদায় করেন যে, তারা বিনইয়ামিনের সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
দ্বিতীয়বার যখন ভাইয়েরা বিনইয়ামিনকে সাথে নিয়ে মিসরে আসে, হযরত ইউসুফ (আঃ) বিনইয়ামিনকে একান্তে ডেকে নিজের পরিচয় দেন এবং তাকে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাদ্যশস্য বিতরণের পর ইউসুফ (আঃ)-এর নির্দেশে একটি রাজকীয় পানপাত্র (সোনার বাটি) বিনইয়ামিনের মালপত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়। কাফেলা যখন শহর ত্যাগ করতে উদ্যত হয়, তখন রাজকর্মচারীরা চুরির অভিযোগ তোলে এবং তল্লাশি চালিয়ে বিনইয়ামিনের মালপত্র থেকে সেই পানপাত্র উদ্ধার করে। তৎকালীন মিসরীয় আইন অনুযায়ী, চোরের শাস্তি ছিল তাকে দাস হিসেবে রেখে দেওয়া, যার মালপত্র থেকে চোরাই দ্রব্য উদ্ধার হয়েছে।
ভাইয়েরা এই ঘটনায় অত্যন্ত ভীত ও লজ্জিত হয়। তারা বিনইয়ামিনের মুক্তির জন্য অনেক অনুনয়-বিনয় করে, এমনকি তাদের একজনকে বিনইয়ামিনের পরিবর্তে রেখে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বিশেষ করে বড় ভাই ইয়াহুদা (Judah) বিনইয়ামিনকে ছাড়া পিতার কাছে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, কারণ সে পিতার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল।
এই পরিস্থিতিতে হযরত ইউসুফ (আঃ) আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি তাদের কাছে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে বলেন:
"তোমরা কি জানো, তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের (বিনইয়ামিন) সাথে কী আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ?" তারা বলল, "তবে কি তুমিই ইউসুফ?" তিনি বললেন, "আমিই ইউসুফ এবং এই আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সেরূপ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৯-৯০)
ভাইয়েরা তাদের কৃতকর্মের জন্য অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। তারা ক্ষমা প্রার্থনা করলে হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে বলেন:
"আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯২)
তিনি তাদের পিতার কাছে ফিরে যেতে বলেন এবং নিজের একটি জামা দিয়ে দেন, যা পিতার চেহারায় স্পর্শ করালে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন বলে জানান। তিনি তাদের সপরিবারে মিসরে আসার আমন্ত্রণ জানান।
পিতা ইয়াকুব (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ ও স্বপ্নের পূর্ণতা
ভাইয়েরা যখন ইউসুফ (আঃ)-এর জামা নিয়ে কান'আনের পথে রওনা হয়, তখন বহুদূরে থাকা সত্ত্বেও হযরত ইয়াকুব (আঃ) ইউসুফ (আঃ)-এর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন। তিনি বলেন, "যদি তোমরা আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না কর, তবে আমি বলছি, আমি অবশ্যই ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৯৪)
যখন সুসংবাদবাহী দল এসে জামাটি তাঁর চেহারায় রাখল, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন। তিনি আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করেন এবং পুত্রদের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
অতঃপর হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পরিবার-পরিজনসহ মিসরের দিকে রওনা হন। হযরত ইউসুফ (আঃ) সসম্মানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। যখন তারা ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে উপস্থিত হন, তখন তিনি তাঁর পিতামাতাকে সিংহাসনে বসান এবং তাঁরা (পিতামাতা ও ভাইয়েরা) সকলে তাঁর সামনে সিজদাবনত হন (সম্মানসূচক সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়)। এই দৃশ্য দেখে হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেন:
"হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বের স্বপ্নের ব্যাখ্যা। আমার রব একে সত্যে পরিণত করেছেন।" (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০০)
এভাবেই বহু বছর আগে দেখা শৈশবের সেই অলৌকিক স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও দুঃখ-কষ্টের পর হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর পরিবার পুনরায় একত্রিত হয় এবং মিসরে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
মিসরে শাসন ও পরবর্তী জীবন
হযরত ইউসুফ (আঃ) দীর্ঘকাল অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার সাথে মিসরের শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তিনি জনগণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করেন এবং আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেন। কিছু বর্ণনামতে, আজিজের মৃত্যুর পর তিনি জুলেখাকে বিবাহ করেন এবং তাদের সন্তানও হয়। তবে এই বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর শাসনামলে মিসর এক সমৃদ্ধशाली ও শান্তিপূর্ণ রাজ্যে পরিণত হয়।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
হযরত ইউসুফ (আঃ) ১১০ বছর বয়সে (মতান্তরে ১২০ বছর) মিসরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি অসিয়ত করেন যে, তাঁর মরদেহ যেন তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত ইবরাহিম (আঃ), ইসহাক (আঃ) ও ইয়াকুব (আঃ)-এর সমাধিস্থল হেবরনে (বর্তমান ফিলিস্তিন) দাফন করা হয়। কথিত আছে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ নীলনদের তীরে একটি বিশেষ কফিনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। বহু বছর পর হযরত মুসা (আঃ) যখন বনী ইসরাইলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন, তখন তিনি হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর অসিয়ত অনুযায়ী তাঁর মরদেহ সেখান থেকে তুলে নিয়ে যান এবং পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে দাফন করা হয়।
হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর জীবন থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর জীবন কাহিনী মানবজাতির জন্য অসংখ্য শিক্ষণীয় বিষয়ে পরিপূর্ণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
১. ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আস্থা: জীবনের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও (যেমন কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, দাসত্ব, মিথ্যা অপবাদ, কারাবাস) তিনি ধৈর্য হারাননি এবং সর্বদা আল্লাহর সাহায্যের উপর আস্থা রেখেছেন।
২. চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পবিত্রতা: জুলেখার প্ররোচনা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে পাপ থেকে রক্ষা করেছেন, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
৩. ক্ষমা ও মহানুভবতা: ভাইদের চরম অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা মানবীয় ঔদার্যের এক বিরল উদাহরণ।
৪. প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা: রাজার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলি তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।
৫. কৃতজ্ঞতা: আল্লাহর অশেষ নিয়ামতের জন্য তিনি সর্বদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
৬. আল্লাহর পরিকল্পনার উপর বিশ্বাস: তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানুষের ষড়যন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর পরিকল্পনা ও ইচ্ছাই চূড়ান্ত। আল্লাহ যা করেন, তা বান্দার মঙ্গলের জন্যই করেন, যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা কষ্টকর মনে হতে পারে।
৭. স্বপ্ন ও তার তাৎপর্য: এই কাহিনীতে স্বপ্নের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে এবং এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ কখনও কখনও স্বপ্নের মাধ্যমেও তাঁর বান্দাদের দিকনির্দেশনা দেন।
৮. হিংসা ও ঈর্ষার ভয়াবহ পরিণতি: ভাইদের হিংসা ও ঈর্ষা কীভাবে একটি পরিবারে বিচ্ছেদ ও দুঃখ ডেকে আনতে পারে, তা এই কাহিনীতে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
৯. দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতা: মিসরের প্রশাসক হিসেবে তিনি অত্যন্ত সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপসংহার
হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনী একাধারে নাটকীয়তা, আবেগ, নৈতিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ভরপুর। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কাহিনী নয়, বরং মানব জীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য পথনির্দেশক। তাঁর জীবনের উত্থান-পতন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চূড়ান্ত সাফল্য আমাদের এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করে যে, যারা আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা রাখে, ধৈর্য ধারণ করে এবং সৎপথে চলে, আল্লাহ তাদের কখনও নিরাশ করেন না। "আহসানুল কাসাস" বা সর্বোত্তম এই কাহিনী যুগে যুগে মানুষকে সত্য, ন্যায়, ক্ষমা ও ধৈর্যের পথে অনুপ্রাণিত করে যাবে। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তুলতে পারি। আল্লাহ আমাদের সকলকে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর মতো উন্নত
চরিত্র ও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

0 মন্তব্যসমূহ